Powered by Blogger.

Friday, June 13, 2014

শবে বরাত ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা : পর্ব-৫

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে

শবে বরাত সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহর অবস্থান
শবে বরাত উদযাপন করা না করার ক্ষেত্রে বিশ্বের মুসলিমদেরকে চার ভাগে ভাগ করা যায়
প্রথমত : যারা কোনভাবেই শবে বরাত উদযাপন করেন না উদযাপন করাকে ইসলাম সম্মত মনে করেন না। 
দ্বিতীয়ত : যারা সম্মিলিতভাবে শবে বরাত উদযাপন করেন না ঠিকই, কিন্তু রাতে ব্যক্তিগতভাবে চুপে চুপেআমল করা ফাযীলাতপূর্ণ মনে করেন, দিবসে রোযা পালন করেন রাত্রি জাগরণ করেন। 
তৃতীয়ত : যারা ১৫ শাবানের রাতে মাসজিদে জমায়েত হয়ে ইবাদাত-বন্দেগী করেন, কবর যিয়ারত করেন, মাসজিদে ওয়াজ-নাসীহাতে শরীক হন, পরের দিন রোযা পালন করেন, এই রাতে হায়াত-মউত, রিয্-দৌলত সম্পর্কে আল্লাহ সিদ্ধান্ত নেন বলে বিশ্বাস করেন। সারা রাত জেগে ইবাদাত-বন্দেগী করেন। তবে আতশ-বাযি, মোমবাতি জ্বালানো আলোকসজ্জা ইত্যাদিকে নাজায়েয বলে জানেন
চতুর্থতযারা ১৫ শাবানের রাতে আতশবাজি, আলোক সজ্জা আমোদ ফুর্তি করেন সময় সুযোগ মত ইবাদাত-বন্দেগীও করেন
চার প্রকার লোকদের মধ্যে প্রথম প্রকারের মানুষের সংখ্যাই বেশী। আমি কিন্তু কথা বলতে চাচ্ছি না যে, অধিকাংশ মুসলিম শবে বরাত পালন করেন না বলে তা করা ঠিক নয়। বরং আমি বলতে চাচ্ছি যে, শবে বরাত সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি শবে বরাত উদযাপন বিদআত হওয়ার একটা স্পষ্ট আলামত। ক্ষেত্রে আমি বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ) এর কিতাবশির্ বিদয়াতথেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যথার্থ মনে করছি। তিনি লিখেছেন,“আল্লাহর দ্বীন শরীয়তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো বিশ্বব্যাপী সম-আদর্শতা। এই সমাদর্শ সাদৃশ্যতা যেমন কাল সময়ের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় তেমনি স্থানের ক্ষেত্রেও। আল্লাহ হচ্ছেন রাব্বুল মাশরিকাইন ওয়া রাব্বুল মাগরিবাইন; পূর্ব-পশ্চিম সকল কিছুর রব মালিক। তিনি স্থান কালের সীমা বাধার উর্দ্ধে। তাই তাঁর শরীয়াত তাঁর দ্বীনে এক অত্যাশ্চর্য সমতা সমাদর্শ বিদ্যমান। তাঁর আখিরী শরীয়াত আখিরী নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শে এসে যা হয়েছে তাকমীল -পূর্ণতা প্রদীপ্ত সূর্যের মতই সকলের জন্য সমান এবং আকাশ মাটির মত সকলের জন্য সম উপযোগীতাপূর্ণ। প্রথম যুগে এর যে রূপ আকৃতি ছিল হিজরী পনের শতকেও উহার রূপ আকৃতি সেই একই। প্রাচ্যবাসীদের জন্য এটি যেমন যতটুকু, ঠিক তেমন ততটুকুই প্রতীচ্যের জন্য। যে সমস্ত নীতি নির্দেশ, ইবাদাতের যে রূপ আকৃতি, আল্লাহর নৈকট্য লাভের যে সমস্ত সুনির্ধারিত পন্থা উপায় আরবদের জন্য ছিল ঠিক তদ্রূপ আছে তা ভারতবাসীর জন্যও। তাই দুনিয়ার যে কোন অংশের একজন মুসলিম অধিবাসী অপর কোন অংশে যদি চলে যায় তাহলে ইসলামী ফরয আদায় এবং ইবাদাত-বন্দেগী করার ক্ষেত্রে তার কোন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় না। তার জন্য কোন স্থানীয় গাইডের প্রয়োজন পড়ে না। তিনি যদি আলিম হন, শরীয়ত সম্পর্কে বিজ্ঞ হন তাহলে কেবল মুক্তাদীই নয় অধিকন্তু যে কোন স্থানে তিনি ইমামও হতে পারেন
বিদআতের অবস্থা এর বিপরীত। এতে সমদৃশ্যতা একত্বতা নেই। স্থান কালের প্রভাব এতে পরিস্ফুট থাকে। গোটা মুসলিম বিশ্বে এর একটিমাত্র রূপে প্রচলনও হয়ে ওঠে না।
সকল ধরনের বিদআতের ক্ষেত্রে উপরোক্ত কথা প্রযোজ্য। শবে বরাত এমনি একটা বিষয় যা আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের লোকেরা মহা ধুমধামে উদযাপন করছি, কিন্তু অন্য এলাকার মুসলিমদের কাছে সম্পর্কে কোন খবর নেই। কি আশ্চর্য! এমন এক মহা-নিয়ামাত যা মক্কা-মদীনার লোকেরা পেলনা,অন্যান্য আরবরা পেলনা, আফ্রিকানরা পেলনা, ইন্দোনেশীয়, মালয়েশীয়রা পেলনা, ইউরোপ-আমেরিকা-অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশের লোকেরা পেলনা; অথচ ভাগ্যক্রমে সৌভাগ্যের মহান রাত পেয়ে গেলাম আমরা উপ-মহাদেশের কিছু লোকেরা শিয়া মতাবলম্বরী
বিষয়টি যদি বিভ্রান্তিকর না হত তাহলে সকল মুসলিমের পাওয়ার কথা ছিল। হাদীসে এসেছে :
عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: إن الله تعالى لا يجمع أمتي على ضلالة. (رواه الترمذي وصححه الألباني في صحيح الجامع رقم 1848)
সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতকে কোন গোমরাহী বা বিভ্রান্তিতে একমত হতে দিবেন না।”[1]
অন্য বর্ণনায় এসেছে.
عن أنس رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إن الله تعالى قد أجار أمتي أن تجمع على ضلالة.
সাহাবী আনাস (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতকে কোন ভ্রান্ত বিষয়ে একমত হওয়া থেকে মুক্তি দিয়েছেন।[2]
হাদীসের অর্থ হল আমার উম্মত যদি কোন বিষয়ে একমত হয় তাহলে সে বিষয়টি বিভ্রান্তিকর হতে পারে না। আর আমার উম্মতের কোন বিষয়ে একমত না হওয়ার বিষয়টি বিভ্রান্ত হওয়ার একটা আলামত হতে পারে
শবে বরাত এমনি একটিআমল যে উম্মতে মুসলিমাহ বিষয়ে কখনো একমত হয়নি,হওয়া সম্ভবও নয়। আবার যারা উদযাপন করেন তাদের মধ্যেও দেখা যায়আমল বিশ্বাসের বিভিন্নতা
শবে বরাত সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার দায়িত্ব উলামায়ে কিরামের
ইসলাম ধর্মে যতগুলো বিদআত চালু হয়েছে তা কিন্তু সাধারণ মানুষ বা কাফির মুশরিকদের মাধ্যমে প্রসার ঘটেনি। উহার প্রসারের জন্য দায়ী যেমন এক শ্রেণীর উলামা, তেমনি উলামায়ে কিরামই যুগে যুগে বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, জেল-যুল্ বরদাশত করেছেন
তাই বিদআত যে নামেই প্রতিষ্ঠা লাভ করুক না কেন উহার বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করতে হবে আলেমদেরকেই। তারা যদি এটা না করে কারো অন্ধ অনুসরণ বা অনুকরণ করেন, বিভ্রান্তি ছড়ান বা কোন বিদআতী কাজ-কর্ম প্রসারে ভূমিকা রাখেন, তাহলে জন্য তাদেরকে আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহি করতে হবে। যে দিন বলা হবে
وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ.
আর সে দিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা রাসূলদের আহ্বানে কিভাবে সাড়া দিয়েছিলে?”[3]
সেদিন তো প্রশ্ন করা হবে না যে, তোমরা অমুক পীরের মত অনুযায়ী বা অমুক ইমামের মত অনুযায়ীআমল করেছিলে কিনা। যারা সহীহ সুন্নাহ মতআমল করবে তারাই সেদিন সফলকাম হবে
তথ্যসূত্র :-
[] তিরমিযী
[]সহীহুল জামে
[] সূরা কাসাস, ৬৫

লেখক :-
মুহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম
সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

উত্তরা ইউনিভার্সিটি,ঢাকা

0 comments:

Widget is loading comments...
My Blogger TricksAll Blogger TricksAll Blogging Tips

About This Blog

Lorem Ipsum

  © Blogger templates Newspaper III by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP